অল্প সময়ে বড় সিলেবাস পোষ মানানোর মিশন

অপরিচিত | Jan ০৮, ২০১৮
অল্প সময়ে বড় সিলেবাস পোষ মানানোর মিশন

এই আর্টিক্যাল তাদের জন্য, যারা সারাবছর টেক্সট বইগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণে পাপ সঞ্চয় করেছ, এবং যেইনা পরীক্ষা ঘনিয়ে এসেছে মহাভারত (বিশাল সিলেবাস) মুখস্থ করে পাপ-স্খলনের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছ। শিক্ষকের বাঁকা কথাও শুনছ, “এহ! সারা বছর পড়ার নাম নেই, এখন এসেছে মহাভারত উদ্ধার করতে!” কিন্তু কথা সোজা, বাঁকা, হ্রস্ব, দীর্ঘ, কাঁচা, পাকা- যাই হোক না কেন, শেষ কথা হলো--- বিশাল সিলেবাস বাকী রয়ে গেছে, এদিকে পরীক্ষা নাকের গোড়ায়; যে করেই হোক প্রস্তুতি নেয়া চাই। কিন্তু প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখলে, পরীক্ষার আগে আগে এই ‘মহাভারত উদ্ধার’ বিষয়টা মোটেই সহজ নয়। ১২-১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও পুরনো অনেক কিছুর সঙ্গে নতুন অনেক কিছু গুলিয়ে-টুলিয়ে একেবারে হালুয়া হয়ে যাচ্ছে। এই যখন ব্যাপার, তাহলে এই কার্যক্রম শুরু করার আগে কিছু বিষয় মাথায় রেখেই কর।

১। বড় অধ্যায় ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড় 

“খাব যখন, একসঙ্গে পেট পুরে খাব”—এমন নীতিতে চললে পেট মোটা হয়ে যাবে, কিন্তু শরীরে শক্তি থাকবে না মোটেই। তাই অল্প অল্প করে বার বার খাও। এটা স্বাস্থ্য-কথা। ডাক্তাররা বলে থাকেন। বিস্ময়করভাবে লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা আসলে তাই। একসাথে একটা বিশাল অধ্যায় নিয়ে বসলে ঝামেলায় পড়তে হবে। তারচে’ ভালো, অধ্যায়টা ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে পড়। প্রতিটা ভাগের আবার কি-ওয়ার্ড ঠিক করে নাও। অর্থাৎ, ঐ অনুচ্ছেদটুকুতে কোন বিষয়টুকু আলোচিত হয়েছে সেটা মাথায় রাখো, বা কলম দিয়ে লিখে রাখো।

২। এক সঙ্গে ২ ঘণ্টার বেশি পড়া নয় 

একটানা পড়ার অনুকূল সময়টুকু হল ২ ঘণ্টা। তাই ২ ঘণ্টার বেশি একটানা পড়া ঠিক নয়। অতি মনোযোগে মনোযোগ ব্যাহত হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটে এতে। ভালো হয়, যদি এই দুই ঘণ্টা সময়কেও ৫ মিনিটের বিরতিতে ভাগ করে নিতে পার। ২৫ মিনিট পড়ে ৫ মিনিটের বিরতি নাও। তাহলে দেখবে, পুরো ১২-১৪ ঘণ্টা পড়েও পড়ার ক্লান্তি অতটা অনুভূত হচ্ছে না।

৩। মাথাকে প্রকৃত বিরতি দাও

২ ঘণ্টা পড়ার পর এক ঘণ্টা বিরতি নিলে ঠিকই, কিন্তু এই সময়েও তুমি বন্ধুর সঙ্গে বা পরিবারের অন্য কারো সঙ্গে পড়াশোনা বা পরীক্ষা নিয়েই আলোচনা করলে, তাহলে কিন্তু প্রকৃত বিরতি নেয়া হল না। মস্তিষ্ক ঠিক একই কাজেই নিয়োজিত রইল। বিরতির সময়টুকু পড়ার বাইরে থাকো। মাথাকে চাপমুক্ত রাখো। যদি বিরতির সময়টুকু চাপমুক্ত থাকতে না পারো, তাহলে বিরতির পরের পড়ার সময়টা কার্যকর হবে না খুব একটা।

৪। পড়ার মূল বিষয়গুলিতে বেশি বেশি দৃষ্টি নিবন্ধ কর

পুরো পড়াকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেল- core material(মূল উপাদান) এবং elaborative material (বিস্তৃত উপাদান)। মূল উপাদানের মধ্যে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, তত্ত্ব, ডায়াগ্রাম এবং গ্রাফ। আর বিস্তৃত উপাদানের মধ্যে থাকবে উদ্ধৃতি, উদাহরণ, ইলাস্ট্রেশন প্রভৃতি। মূল উপাদানকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে পড়।

৫। বিষয়-বৈচিত্র্য মাথায় রেখে প্রতিদিনের পড়ার রুটিন কর

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার মধ্যে মোটামুটি তিন ধরণের বিষয় রয়েছে- স্মৃতিশক্তি নির্ভর বিষয়, সমস্যা সমাধানমূলক বিষয় এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক বিষয়। জীববিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল... এই ধরণের বিষয়গুলোকে মোটামুটিভাবে প্রথম ভাগে রাখা যায়, যেগুলোতে মুখস্থ করার মতো প্রচুর কনটেন্ট আছে। আবার, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, হিসাববিজ্ঞান...এই ধরণের বিষয়গুলোকে দ্বিতীয় ভাগে রাখা যায়। একই রকমভাবে, বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্য... এগুলোকে রাখা যায় তৃতীয় ভাগে। সারাদিনের পড়ার রুটিন করার সময় একই রকম বিষয়গুলোকে একই সাথে না সাজিয়ে বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য অন্যান্য ধরণের বিষয়গুলোকে পর পর সাজানো উচিত। এতে পড়ায় ক্লান্তি আসার সম্ভাবনা কমে যায়।

৬। শেখা জিনিস নোট কর

দেখেই চোখ কপালে তুলে ফেলেছ? পরীক্ষার সময় নোট করব—এ আবার কোন পাগলামী! ছোট বেলায় আমাদের মা-বাবা, চাচা-জেঠুরা একটা কথা বলতেন- “একবার লেখো, দশবার পড়ার সমান হবে।”  কথাটা ভুল কিছু নয়। শেখা জিনিস লেখার ফলে অনেক বেশি মনে থাকে। আবার, পড়ার সময় কম বুঝেছি, এমন অনেক কিছু হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু পরীক্ষার সময় এতো পড়ার সময় কি আসলেই আছে? না, নেই। তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, পয়েন্ট, চিত্র ইত্যাদি পড়ার পর নোট করে ফেলো। এগুলো পরীক্ষার আগের রাতে চোখ বুলানোর জন্য দারুণ কাজে দেবে।

৭। বুঝে বুঝে পড় এবং SQ5R নীতি ঠিক রাখো

যে কোন পড়াই ভালোভাবে আত্মস্থ করার পূর্বশর্ত হল ভালো করে বুঝে পড়া এবং সঠিক উপায়ে নোট নেয়া। এই ক্ষেত্রে SQ5R নীতি বেশ ফলদায়ক। SQ5R—মানে,  Survey, Questions, Read, Record, Recite, Review and Reflect

  • যে কোন পড়া Survey কর। অনুচ্ছেদগুলোর ওপর চোখ বুলাও, এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো মার্ক কর। ৭-১০ মিনিট ব্যয় কর।
  • বইয়ে যেসব হেডিং বা সাব-হেডিং থাকে, পড়ার সময়ই ঠিক করে ফেলো, এগুলোর কোনটা থেকে Question হতে পারে। দাগ দাও। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ অংশের পাশে সেই সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন লিখে রাখো।
  • Read, Record এবং Recite-এর দিকে মনোযোগী থাকো। অনুচ্ছেদগুলো আবার পড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিজের কণ্ঠস্বরে রেকর্ড করে রাখো। visual representation-এর জন্য সেগুলোকে বুলেট বা বক্স করে রাখো টেক্সটের পাশে। কাজ শেষে নিজের করা নোটগুলো স্পষ্ট করে জোরে জোরে উচ্চারণ কর। 
  • যে নোটগুলো নিয়েছ বা প্রশ্নগুলো লিখেছ, সেগুলোর Review কর। নিজেকে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস কর, এবং উত্তর দিতে পার কিনা দেখ।
  • উপরের স্টেপগুলো repeat করতে থাকো, পুরো বিষয়টা কব্জায় আসা পর্যন্ত।  

 

৮। পড়া বেশি বেশি চোখে পড়ার ব্যবস্থা কর

গুরুত্বপূর্ণ সাল, তারিখ, ভোকাব্যুলারি, সূত্র-- যেগুলো মনে রাখতে কষ্ট হয়, স্টিকি নোট করে রাখো কিচেনে, বাথরুমে কিংবা ঘরের এমন সব জায়গায়, যেগুলোতে তোমার বেশি যাতায়াত ঘটে। আসা-যাওয়ার পথে চোখ পড়তে পড়তে সেগুলো একসময় আত্মস্থ হয়ে যাবে। ফ্ল্যাশকার্ডও তৈরি করে রাখতে পারো। 

৯। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিভিশন দাও

যদি এমন হয় যে পরীক্ষার ঠিক আগে আগে তুমি সম্পূর্ণ নতুন একটা চ্যাপ্টার পড়ছ, তাহলে Recapped, Reviewed and Reinforced- এই 3R-এর ওপর গুরুত্ব দাও। যে কোন নতুন তথ্য শিখে সেটা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিভিশন না দিলে ৮০% সম্ভাবনা আছে ভুলে যাবার। তাই, শেখা জিনিস ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রিভিশন দিয়ে ফেলো।

১০। পর্যাপ্ত ঘুমাও

পর্যাপ্ত এবং ভালো ঘুমই শর্ট টার্ম মেমোরিকে লং টার্ম মেমোরিতে পরিণত করতে সাহায্য করে সবচে’ বেশি। লং টার্ম মেমোরিতে পরিণত না হলে পরীক্ষার হলে বসে পড়া মনে করবে কী করে? তাই, অধিক পড়তে গিয়ে ঘুম নষ্ট করা মোটেই ঠিক হবে না। অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা ভালো ঘুমের প্রয়োজন আছে।

একটা কথা বলে রাখি, অল্প সময়ে পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়-আশয় লিখলাম বলে এটা মনে করার কোন কারণ নেই, আমরা অল্প অল্প করে পড়ে সারা বছর ধরে প্রস্তুতি নেয়ার বিষয়টাকে জোর দিচ্ছি না। সেটাই আসল প্রস্তুতি। অল্প সময়ে মহাভারত মুখস্থ করতে গিয়ে যদি ‘অশ্বত্থামা হতঃ ইতি’ হয়ে যান, তাহলে কি আর উদ্দেশ্য সফল হবে? ‘অশ্বত্থামা হতঃ ইতি’ কি তোমরা পড়েছ? শিবরাম চক্রবর্তীর একটা গল্প। না পড়লে পড়ে নিও।